"যে রূপকথায় কাঁদে চোখ"
লামিয়া এয়ারলাইন্স। ফ্লাইট নং আই২৯৩৩।
মোট ৭৭ জন যাত্রী নিয়ে স্যান্টাক্রুজ থেকে টেকঅফ করলো বিমানটি। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, এই যাত্রীদলের মধ্যে রয়েছেন ব্রাজিলের চ্যাপেকোয়েন্সে দলের ফুটবলার এবং সাপোর্ট স্টাফরা। তাঁদের ক্লাবের ইতিহাসের সবথেকে বড় ম্যাচ খেলতে কলম্বিয়ার মেদেলিনের উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছেন তাঁরা। যদিও ফুটবলারদের সোশ্যাল মিডিয়া দেখে সেই প্রভূত চাপের কোনও আঁচ পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রত্যেকেই ভীষণ হাসিখুশি ভাবে উপভোগ করছিলেন সবটাই। এ-প্রসঙ্গে মনে পড়ছে ফাইনালে যোগ্যতা অর্জনের দিন খুশিতে উদ্বেল চ্যাপেকো দলের কোচ কাইরো জুনিয়রের একটি উক্তি– "If I die today, I'll die happily."
তিনি হয়তো দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেননি, কিছুদিনের মধ্যেই এ কথা দেখা দেবে নিয়তির চরম পরিহাস হয়ে। ২৯ নভেম্বর, ২০১৬। ব্রাজিলীয় ফুটবল তথা বিশ্বফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনার শোকচিহ্ন হয়ে রয়ে গেলো এই অভিশপ্ত তারিখ।
ব্রাজিলের স্যান্টা ক্যাথারিনার পশ্চিমে অবস্থিত চ্যাপেকো বা 'শাপেকো' শহর। সে শহরেরই ফুটবল আবেগের কেন্দ্রবিন্দু হলো 'অ্যাসোসিয়াকাও চ্যাপেকোয়েন্সে দে ফুটবল' বা সংক্ষেপে 'চ্যাপেকো' ফুটবল ক্লাব। ২০০৯ সালেও যারা খেলতো ব্রাজিলীয় ফুটবলের চতুর্থ ডিভিশন 'সেরি ডি'-তে। ধীরে ধীরে সেরি সি, সেরি বি ডিভিশনগুলি পার করে এসে ২০১৪ সালে যোগদান প্রথম ডিভিশন ফুটবল অর্থাৎ 'সেরি এ' তে– যে ডিভিশনে খেলে পালমেইরাস, ফ্ল্যামেঙ্গো, গ্রেমিও, সান্তোস ইত্যাদি তথা ব্রাজিলীয় ফুটবলের নামকরা ক্লাবগুলি। প্রসঙ্গত, যে টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলতে ফ্লাইট বোর্ড করেছিল চ্যাপেকো দল, তা হল দক্ষিণ আমেরিকার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ক্লাব টুর্নামেন্ট, কোপা সুদামেরিকানা। ইউরোপের ক্ষেত্রে ইউয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের পরেই যেমন ইউরোপা লিগের গুরুত্ব, তেমনি লাতিন আমেরিকার ক্ষেত্রে কোপা লিবের্তাদোরেসের পরেই এই টুর্নামেন্ট গুরুত্ব পায়। ফাইনালে ওঠার আগে আর্জেন্টিনার বিখ্যাত ক্লাব ইন্দিপেন্দিয়েন্তে-কে, সেমি-ফাইনালে আর্জেন্টিনার আরেক বিখ্যাত ক্লাব সান লোরেঞ্জো-কে হারিয়েছিল তারা। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে একটা সাধারণ মানের ফুটবল দলের অবিশ্বাস্য হয়ে ওঠার এই উত্থান যেন রূপকথার গল্পকেও হার মানায়।
তবে ঠিক কীভাবে ঘটেছিল এই দুর্ঘটনা? এর উত্তরে পাওয়া যায় অনেক উত্তরই। ব্রাজিলের সাও পাওলো থেকে এই উড়ান প্রথমে পৌঁছেছিল স্যান্টাক্রুজ বিমানবন্দরে। সেখান থেকে বিমানের পরবর্তী বা শেষ গন্তব্য ছিল কলম্বিয়ার মেদেলিন, যে শহরের ক্লাব আতলেতিকো নাসিওনালের বিরুদ্ধে চ্যাপেকোর ফাইনাল ম্যাচের প্রথম লেগ অনুষ্ঠিতব্য ছিল। এই শেষ ফ্লাইটের ক্ষেত্রে, পাইলটের গাফিলতিতে ধরা পড়েনি যে বিমানের পর্যাপ্ত জ্বালানীর থেকে অনেক কম জ্বালানি রয়েছে। এমনকি এই উড়ানের আগেও তাঁর সেই কথা মাথায় রাখেননি। যার ফলশ্রুতি হিসেবে, মেডেলিনের কাছেই স্থানীয় সময় রাত ১০:১৮ নাগাদ একটি পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়ে বিমানটি। মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হন ৭৭ জন যাত্রীর প্রত্যেকেই; যাঁদের মধ্যে মাত্র ৬ জন সার্ভাইভ করতে পেরেছিলেন, এদের মধ্যে ছিলেন তিনজন ফুটবলারও।
ফুটবলবিশ্বের সৌভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতাবোধ ফুটে উঠেছিল অসংখ্য শোকবার্তায়, অসংখ্য শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের মাধ্যমে। তবে চ্যাপেকো দলকে শ্রদ্ধা জানানোর সবথেকে বড় উদ্যোগটা নিয়েছিলেন তাদের ফাইনালের প্রতিপক্ষ, নাসিওনাল দলের কর্তাব্যক্তিরা। লাতিন আমেরিকার ফুটবল নিয়ামক সংস্থা তথা কোপা সংগঠক কনমেবলের কাছে তারা আবেদন করেছিলেন চ্যাপেকোকে সে বছরের কোপা চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করার জন্য। এই মানবিক আবেদনে সাড়া দিয়ে কনমেবল ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬ চ্যাপেকো দলকে ওই সিজনের চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করে। এছাড়াও বার্সেলোনার প্রথামাফিক জোয়ান গ্যাম্পার ট্রফিতে চ্যাপেকোকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, ক্যাম্প-ন্যুতে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হয়। ব্রাজিলের অন্য ডিভিশনের দল কোনও ট্রান্সফার ফি ছাড়াই চ্যাপেকোকে খেলোয়াড় ধার দেওয়ার প্রস্তাব জানায়।
ফুটবলের যে রূপকথা হয়ে উঠতে পারতো লেস্টারের ইপিএল জয় অথবা পোর্তোর চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের মতো সোনালি অধ্যায়ের অংশীদার, সে স্বপ্ন শেষ হয়ে যায় দুঃস্বপ্নের মতো। অথচ ফুটবলের সৌহার্দ্য যে শুধু মাঠেই নয়, তা আবার প্রমাণিত হয়। মনে করিয়ে দেয় বিখ্যাত স্কটিশ ফুটবল খেলোয়াড় বিল শ্যাঙ্কলির অবিস্মরণীয় উক্তি– "Some people believe football is a matter of life and death, I am very disappointed with that attitude. I can assure you it is much, much more important than that."
❤️
ReplyDeleteThank you didi.♥️
Delete♥️♥️
ReplyDeleteThank you!♥️
Delete