ডিসগ্রেস অফ গিয়ন
গ্যালারিতে ক্ষিপ্ত দর্শকবৃন্দের থেকে ছিটকে আসছিল নানারকম ব্যঙ্গাত্মক উক্তি। পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া– দু'দলের খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যেই ভেসে আসছে কথাগুলো– "Get out in Algeria", "Let them kiss!" মাঠে উপস্থিত আলজেরিয়ান সমর্থকেরা মাঠের দিকে উদ্দেশ্য করে ওড়াতে নোট শুরু করলেন একরাশ নোট, শোনা গেল সংবদ্ধ চিৎকার– "It's a fix!" প্রতিবাদের তীব্র ভাষায় মুখর হয়ে উঠলো ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চ।
ঘটনার সূত্রপাত হয় ১৯৮২ স্পেন বিশ্বকাপের গ্রুপ টু-তে পশ্চিম জার্মানি, অস্ট্রিয়া, আলজেরিয়া এবং চিলে একই গ্রুপে পড়ায়। ১৯৮০ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন পশ্চিম জার্মানি বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট দল হিসেবে স্পেনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল। ইউরোপের অস্ট্রিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার চিলের পাশাপাশি গ্রুপের চতুর্থ দল, আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়া প্রথমবার সুযোগ পেয়েছিল বিশ্বকাপে খেলার। দলের মূল ভরসা ছিল আলজেরিয়ান লিগে সিজনে ২৮ ম্যাচে ৪০ গোল করে আসা ফরোয়ার্ড রাবাহ মাদজের এবং মিডফিল্ডার লাখদার বেলৌমি। নূন্যতম আশা এবং একবুক উৎসাহ নিয়ে তারাও পা রাখে স্পেনের মাটিতে।
অথচ, দ্বাদশ বিশ্বকাপের যে আসর হয়ে উঠতে পারতো ফুটবলের ইতিহাসে আরেকটি নতুন অধ্যায়ের সূত্রপাত; ঘটনাপরম্পরায় সেই বিশ্বকাপের গায়ে লেগেছিল কলঙ্কের গভীর দাগ। যে ঘটনাপ্রবাহ হার মানায় আমাদের সাধারণ কল্পনাকেও।
প্রথম রাউন্ড, জুন ১৬ এবং ১৭, ১৯৮২
"I will dedicate the seventh goal to my wife and the eighth to my dog."
১৬ তারিখ আলজেরিয়ার সাথে প্রথম ম্যাচে মুখোমুখি পশ্চিম জার্মানি। তারকাসমৃদ্ধ জার্মান দল ম্যাচ শুরুর আগেই ভেবে নিয়েছিল, তথাকথিত দুর্বল আলজেরিয়া দলকে হেলায় হারাবে তারা। যার প্রমাণস্বরূপ এক জার্মান খেলোয়াড়ের উপরিউক্ত উক্তিটির অবতারণা। যদিও এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের ফল খুব শীঘ্রই পেয়ে যায় পশ্চিম জার্মানি। গ্রুপের ওপেনিং ম্যাচেই জার্মানিকে ২-১ গোলে হারিয়ে দেয় আলজেরিয়া। পরদিন গ্রুপের অন্য ম্যাচে অস্ট্রিয়া চিলেকে ১-০ গোলে হারায়। প্রথম রাউন্ডের শেষে গ্রুপের শীর্ষে থাকে আলজেরিয়া।
দ্বিতীয় রাউন্ড, ২০ এবং ২১ জুন, ১৯৮২
প্রত্যাশার প্রবল চাপে থাকা পশ্চিম জার্মানি ৪-১ গোলে হারিয়ে দেয় চিলেকে। যে ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেন কার্ল হেইঞ্জ রুমেনিগে। পরদিন অর্থাৎ ২১ জুন, আলজেরিয়ার যাত্রাপথে কাঙ্খিত কাঁটাটি ছড়িয়ে দেয় অস্ট্রিয়া। ০-২ গোলে হেরে যায় আলজেরিয়া। দ্বিতীয় রাউন্ডের শেষে অস্ট্রিয়া থাকে গ্রুপের শীর্ষে। জার্মানি দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও তাদের চাপ ক্রমশই বাড়ছিল।
তৃতীয় রাউন্ড, ২৪ এবং ২৫ জুন, ১৯৮২
২৪ জুন আলজেরিয়া চিলেকে ৩-২ গোলে হারিয়ে গ্রুপের পয়েন্ট টেবিলে একধাপ এগিয়ে আসে। এই ফলাফলের ভিত্তিতে অস্ট্রিয়া প্রায় কোয়ালিফাই করে যায় এবং সমস্ত চাপ এসে পড়ে পশ্চিম জার্মানির ওপর, যাদের কাছে শেষ ম্যাচটি হয়ে ওঠে "Do or die" ম্যাচ।
২৫ জুন, ১৯৮২। স্পোর্টিং গিয়ন ক্লাবের স্টেডিয়াম স্টাদিও মিউনিসিপালে শেষ রাউন্ডের শেষ ম্যাচে অবশেষে মুখোমুখি হয় পশ্চিম জার্মানি এবং অস্ট্রিয়া। ম্যাচের প্রথম মিনিট থেকেই ক্রমাগত অ্যাটাকে উঠতে থাকে রুমেনিগে, ব্রিটনার, ম্যাথাউস সমৃদ্ধ জার্মান দল। ফলশ্রুতি হিসেবে, ১০ মিনিটের মাথায় হোর্স্ট রুবেখের গোলে ১-০ এগিয়ে যায় পশ্চিম জার্মানি।
ঠিক এরপরেই যা শুরু হয় তা বোধগম্য হতে সময় লাগলেও ক্রমাগত ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটায় মাঠে উপস্থিত দর্শকসহ বিশ্বের নানা প্রান্তের ফুটবলপ্রেমীদের। জার্মানির গোলের পর থেকেই কোনও অজানা কারণে নিজেদের হাফের মধ্যে নিজেরা ছোট ছোট পাস খেলতে শুরু করে দুই দলই। ম্যাচে মনোনিবেশ করার বা গোল করার কোনও প্রচেষ্টাই দেখা যায় না দু'দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে! প্রথম হাফ ১-০ গোলেই শেষ হয়। দ্বিতীয় হাফেও অবস্থার কোনও পরিবর্তন ঘটে না। এই হাফে দুই দল মাত্র তিনটি শট অ্যাটেম্পট করে, যার একটিও অন টার্গেট ছিল না! ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত দর্শকবৃন্দের থেকে ভেসে আসে কটূক্তি, জার্মান ব্রডকাস্টার খেলা চলাকালীনই বলে ওঠেন– "What's happening here is disgraceful and has nothing to do with football." এভাবেই শেষ হয় ম্যাচ। পরের রাউন্ডে যাওয়ার স্বপ্নভঙ্গ হয় আলজেরিয়ার।
আসলে, দুই ইউরোপিয়ান দলের মূল উদ্দেশ্য ছিল আলজেরিয়াকে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দেওয়া। যেহেতু গ্রুপের শীর্ষ দুই দল পরবর্তী রাউন্ডে কোয়ালিফাই করতে পারতো, তাই অস্ট্রিয়া এবং জার্মানির দরকার ছিল এমন কিছু যা দুটি টিমকেই টুর্নামেন্টে রাখবে। তার ফলস্বরূপ সেই যুগপৎ, ঘৃণিত প্রচেষ্টা চাক্ষুষ করেছিল সারা বিশ্বের অসংখ্য দর্শক। ম্যাচের রেফারি বব ভ্যালেন্টাইনও সমালোচিত হয়েছিলেন কড়া হাতে ম্যাচ পরিচালনা না করার জন্য। নিজেদের দেশের সংবাদমাধ্যমের কাছেই সমালোচিত হয়েছিলেন পশ্চিম জার্মানি এবং অস্ট্রিয়ার খেলোয়াড়, কোচ, অনেকেই। আলজেরিয়ার জাতীয় ফুটবল সংস্থা দুই দেশের বিরুদ্ধে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ জানায় ফিফার কাছে। অথচ সাড়ে তিন ঘণ্টার তদন্তপ্রক্রিয়া শেষেও ফিফা অভিযোগটি মেনে নিতে অসম্মতি জানায়। কাকতালীয় ভাবে তৎকালীন ফিফা ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন হারম্যান নিউবার্গার, যিনি একইসাথে ছিলেন পশ্চিম জার্মানি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট!
এমন অদৃশ্য অঙ্গুলিহেলনে সংঘটিত হয়েছিল বিশ্বকাপের ইতিহাসের জঘন্যতম ফুটবল ম্যাচ, যা আজও পরিচিত "Disgrace of Gijon" নামে।
PS: এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তীতে ফিফার রুলবুকে স্থান পায় নতুন নিয়ম Article 32-8, যাতে বলা হয়– "The last two matches in each group shall have simultaneous kick-off time on the same day."
Bahh
ReplyDeleteThank you bodda.♥️
DeleteMera Bhai ❤️
ReplyDeleteThanku Bhai!♥️
DeleteExcellent ❤️
ReplyDelete