যুদ্ধক্ষেত্রের ফুল
১
পাহাড়ের কোলের ছিমছাম বাসস্থান থেকে কিছুটা দূরেই পালিত মেষশাবকগুলিকে চারণের উদ্দেশ্যে নিয়ে বেরিয়েছেন বৃদ্ধ শেপার্ড। বাড়িতে রয়েছেন তাঁর পুত্র স্তিপে, এবং ছয় বছর বয়সী পৌত্র লুকা। দাদুর প্রিয় নাতি লুকা অপেক্ষা করছে, কখন দাদু ফিরলে তার কাছে আবার গল্প করতে, শেপার্ড-জীবনের কাহিনী শুনবে সে!
এমন মুহূর্তে হঠাৎ ছন্দপতন। দূরে যেদিকে লুকার দাদু গিয়েছেন, সেদিক থেকে হঠাৎ ভেসে এসেছে কয়েকটি গানশটের শব্দ! সামান্য কালবিলম্ব না করে পুত্রকে নিয়ে মাটির নীচের ঘরে লুকিয়ে পড়লেন স্তিপে। ঘরে অগ্নিসংযোগ করল আততায়ীরা। পাহাড়ের শান্ত পরিবেশে ততক্ষণে থাবা বসিয়েছে হিংস্র শেটনিক বাহিনীর আগ্রাসন। হিংসার রক্তে লাল হয়ে উঠছে ক্রোয়েশিয়া-সার্বের মাটি।
২
সিনেমা নয়। বাস্তবের এই হিংস্রতা নিশ্চিত হার মানায় রুপোলি পর্দার সমস্ত দৃশ্যায়নকে। ১৯৯১-১৯৯৫ সালব্যাপী ঘটে যাওয়া 'The Croatian War'-এর ছোট অংশ তুলে ধরা হল পাঠকের সামনে। 'Socialist Federal Republic of Yugoslavia' থেকে মুক্তিকামী, ক্রোয়েশিয়ান সরকারের অনুগত সেনাদল এবং সার্ব-নিয়ন্ত্রিত 'Yugoslavia People's Army' (JNA) ও আঞ্চলিক সার্ব শক্তিদের মধ্যে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যে যুদ্ধে মারা যায় প্রায় ২০ হাজার মানুষ, অগণিত মানুষ শরণার্থী হয়ে পুনর্বাসন নেন ক্রোয়েশিয়া এবং সার্বিয়ার বিভিন্ন অংশে। যদিও শুকনো পরিসংখ্যান কোনও যুদ্ধের কুপ্রভাবকে ব্যাখ্যা করতে পারে না।
অথচ, বৃদ্ধ শেপার্ডকে হত্যা করা সৈন্যটির নাম ইতিহাস মনে রেখেছে কি না, জানা নেই। ইতিহাস বরং তার বুকে স্থান দিয়েছে সেই ছয় বছর বয়সী শিশুকে, একদিন যাকে পৃথিবী চিনবে 'লুকা মদ্রিচ' নামে!
৩
ক্রোয়েশিয়ার যুদ্ধের স্মৃতি বহনকারী স্থানগুলিতে এখনও একটি সাইনবোর্ড দেখা যায়, যাতে লেখা থাকে "Ne prilazite!"– যার অর্থ, "Do not come near!" এমন এক যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকা জাদার থেকে, শরণার্থী দলের সাথে ক্রোয়েশিয়ার পুনর্বাসিত শরণার্থী শিবিরে চলে আসেন স্তিপে, তাঁর পুত্র লুকা এবং স্ত্রী রাদৌকা। 'Hotel Kolavare' নামক সেই শিবিরে পরবর্তী ছ-বছর দিনযাপন করেন তাঁরা।
অদ্ভুত জীবন লুকার। ১৯৮৫ তে জন্ম। ছোটবেলায় কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি হননি তিনি। দাদুর কাছেই মানুষ। দাদুকে হারিয়ে ফেলে, যুদ্ধের ভয়াবহতায় কষ্টকর দিন কাটত তাঁর। ঠিক এই সময়েই ফুটবলকে আঁকড়ে ধরেন লুকা। যদিও ছোট চেহারা এবং দুর্বল স্বাস্থ্যের জন্য কেউই আশা রাখেনি, যে তিনি ফুটবলার হতে পারবেন। এমনকী ১১ বছর বয়সে HNK Hajduk Split ক্লাবের ট্রায়ালেও বাদ পড়েন লুকা।
হাল ছাড়তে তবুও রাজি হননি তিনি। "Fortune favours the brave"– এই আপ্তবাক্যকে জীবনের মূলমন্ত্র বানিয়ে নিলেন তিনি। কঠোর পরিশ্রমের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে দেন লুকা। যার ফলশ্রুতিতে HNK Zadar ক্লাবের বয়সভিত্তিক দলে প্রথম খেলার সুযোগ পান তিনি।
দু-বছর পর, মাত্র ১৫ বছর বয়সে যোগদান করেন ক্রোয়েশিয়ার খ্যাতনামা ক্লাব Dinamo Zagreb-এর অনূর্ধ্ব ১৭ দলে। যদিও প্রথম সিজন আশানুরূপ কাটেনি তাঁর। সুযোগ পেলেন না বেশি। লোন ট্রান্সফারে ২০০৩-'০৪ সিজনে চলে যেতে হলো অপেক্ষাকৃত ছোট ক্লাব Zrinski তে। ক্লাবটির রেলিগেশন আটকাতে তাঁর কৃতিত্ব ছিল তর্কাতীত, লুকা নির্বাচিত হন লীগের বেস্ট প্লেয়ার হিসেবে। Dinamo Zagreb-এর হয়ে ২০০৫-২০০৮ সাল পর্যন্ত পরপর তিনবার ক্রোয়েশিয়ান টপফ্লাইট লীগ চ্যাম্পিয়ন হন তিনি। দু'বার জিতে নেন লীগের বেস্ট প্লেয়ারের শিরোপা।
৪
জীবন তবুও সহজ হয়ে ওঠেনি তাঁর জন্য। জীবনের প্রথম বড় আয়ের অঙ্কটি যিনি খরচ করেছিলেন তাঁর পরিবারের জন্য একটি ফ্ল্যাট কিনতে, তাঁর মতো মানুষের জন্য সত্যিই 'বড়' হয়ে ওঠার পথ কি এতটা সুগম হতে পারে?
লুকা মদ্রিচও পাননি তেমন কোনও পথ। পায়ের নীচে যুদ্ধের চিহ্ন নিয়েই যিনি ২০০৮ সালে চলে এলেন ইউরোপিয়ান টপফ্লাইটে, ইংলিশ ক্লাব টটেনহ্যামের হয়ে খেলতে। আর তাঁর প্রথম দশ ম্যাচে মাত্র একটা জয় পান তিনি। আউট অফ পজিশন খেলতে খেলতে নিজের ফর্মও হারিয়ে ফেলেছিলেন লুকা। এভাবে প্রথম সিজন কাটার পর টটেনহ্যাম কোচের দায়িত্ব নেন হ্যারি রেডন্যাপ, যিনি আমূল বদলে দেন লুকা মদ্রিচকে। ১৬০ ম্যাচে তিনি ৪৩ গোল কন্ট্রিবিউশন রাখেন। যে পারফরম্যান্সের জেরে ২০১২ সালে তাঁকে সই করায় স্পেনের বিখ্যাত ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ।
৫
২০১২ সালের ২৭ আগস্ট, বিখ্যাত স্প্যানিশ সংবাদপত্র Marca তাদের সংবাদপত্রে লিখেছিল, লুকা মদ্রিচ উল্লিখিত সিজনের লা-লিগার সবথেকে খারাপ সাইনিং। যদিও রিয়ালের হয়ে তখনও ডেবিউটুকুও হয়নি তাঁর!
ভাগ্যের ফের তাঁকে তাড়া করে বেরিয়েছে আশৈশব। দাদুর মৃত্যু, শরণার্থী শিবিরে মৃত্যুসম কষ্ট সহ্য করে বড় হয়ে ওঠা, যোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করেও অনুর্দ্ধ ১৭ দলে সুযোগ না পাওয়া, স্পেনে এসে মিডিয়ার পাশাপাশি প্রবল প্রত্যাশার চাপ– সমস্তকিছুই যুদ্ধের আঙ্গিকে ধরা দিল মদ্রিচের কাছে। ভাগ্যদেবতা হয়তো সবার ভাগ্যেই এমন একটি সুযোগ দেন, যা বদলে দেয় মানুষের আমূল জীবন! ভাগ্য অবশেষে সাহসীরই সহায় হয়!
রিয়ালে খেলতে আসা সেই কাঙ্খিত আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিল লুকা মদ্রিচের কেরিয়ারে। বর্তমানে ৩৭ বছর বয়সী, স্বল্পভাষী লুকা মদ্রিচ রিয়ালের হয়ে ২৪ টি মেজর ট্রফি জিতেছেন, যাঁর মধ্যে রয়েছে পাঁচটি চ্যাম্পিয়নস লীগ, তিনটি লা-লিগা। বলাই বাহুল্য, ধীরে ধীরে নিজেকে রিয়াল মাদ্রিদ মিডফিল্ডের সবথেকে ভরসাযোগ্য প্লেয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
৬
২০১৮ সালে ফুটবল বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়া ফাইনালে হেরে যায় ফ্রান্সের কাছে। যদিও দক্ষ মিউজিশিয়ানের মতই অধিনায়ক লুকা পরিচালনা করেছিলেন দলের অর্কেস্ট্রা। জিতে নিয়েছিলেন ২০১৮ বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়, গোল্ডেন বলের শিরোপা। দীর্ঘ ১১ বছর ধরে ব্যালনের মঞ্চে লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে জিতে নিয়েছিলেন ব্যালন ডি'অর। ক্রোয়েশিয়ায় সম্মানিত হয়েছিলেন জাতীয় নায়ক হিসেবে।
মজার বিষয়, যে Marca সংবাদপত্র একদা তাঁকে লালিগার খারাপতম সাইনিং আখ্যায় কটাক্ষ করেছিল, ১০ বছর বাদে ২০২২ সালে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে তাঁর বর্ণময় কেরিয়ারকে শ্রদ্ধা জানিয়ে; তারাই তাঁকে 'Marca Leyenda' সম্মানে ভূষিত করে। যেন সম্পূর্ণ হয় একটি বৃত্ত। ২০২২ সালের রিয়ালের কঠিনতম চ্যাম্পিয়নস লিগ ক্যাম্পেনে তাঁর কৃতিত্ব ছিল অপরিসীম। এতো যুদ্ধের অন্যতম শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা হয়ে, তাই তো অকপটে তিনি বলতে পারেন– "Giving up is not an option!"
সামান্য এ পরিসরে লুকা মদ্রিচের মতো মানুষকে চেনানো সম্ভব হয় না ঠিকই, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের ফুল তো বৃদ্ধ হয় না কোনওদিন। এভাবেই তার সুবাস ছড়িয়ে যায় মানুষ থেকে মানুষের মাঝে– আরেকজন মানুষকে হেরে না যাওয়ার ম্যাজিক শিখিয়ে দিতে!
Great
ReplyDeleteDil jeet liya bhai apni writing se.. The history portion was 🤌🏻🤌🏻..
ReplyDeleteBesh bhalo❤
ReplyDelete🙌
ReplyDeleteDarun ❤️
ReplyDelete❤️❤️❤️
ReplyDelete❤️
ReplyDeleteReally too much good 🙏❤️💖
ReplyDeleteModric is the another name of class🫶❤️
ReplyDeleteAe sala cup namde
ReplyDeleteMy man....🤍
ReplyDeleteDescriptive
ReplyDelete