আর্সেনাল: 'দ্যা ইনভিন্সিবলস'


 

কিছুতেই লন্ডনের হাইবেরি স্টেডিয়ামটা খুঁজে পাচ্ছেন না চল্লিশোর্ধ্ব ভদ্রলোক। এক ট্যাক্সিতে করে তিনি খুঁজতে বেরিয়েছেন উত্তর লণ্ডনের আর্সেনাল ক্লাবের স্টেডিয়াম। ঘুরতে ঘুরতে বিরক্ত হয়ে ট্যাক্সিচালককেই বলে বসলেন– "Where is the stadium?"! 
উত্তরে চালক ঘনসন্নিবিষ্ট বাড়িগুলির মধ্যে একটা জায়গায় এসে দাঁড় করালেন ট্যাক্সি, বললেন– "We are here!" 
ভদ্রলোক অবাক হয়েছিলেন খুব। এভাবে ঘন বসতির মধ্যে ক্লাবের স্টেডিয়াম! যদিও কি তিনি জানতেন, একদিন এই ক্লাবের সঙ্গেই আক্ষরিক অর্থে সমার্থক হয়ে উঠবেন তিনি। আর্সেনালকে তৈরি করবেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও উপভোগ্য ফুটবল টিম হিসেবে! 

লন্ডনের অ্যাভেনেল রোডের ক্লাবটিতে ১৯৯৬ সালে কোচ হয়ে আসেন ফরাসি ভদ্রলোকটি। নাম, আর্সেন ওয়েঙ্গার। স্ট্রাসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইকোনমিক্সে মাস্টার্স ডিগ্রিধারী, বরুশিয়া মনশেনগ্লাডবাখের ভক্ত আর্সেনের ম্যানেজারিয়াল কেরিয়ার খুব যে রত্নখচিত ছিল, তা নয়। তবুও তাঁর ওপর বাজি ধরেছিলেন ডেভিড ডাইন, তৎকালীন আর্সেনাল প্রেসিডেন্ট। সে সময়ে ব্রিটিশ ফুটবলে বিদেশি কোচদের আগমন বেশি দেখা যেতো না। ওয়েঙ্গারের আগে কেবল ওসভালদো আর্দিলেস এবং রুদ গুলিট ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে বিদেশি কোচ হিসেবে এসেছিলেন। তাই স্বভাবে ধীরস্থির, নম্র আর্সেনের প্রথম কয়েকটি বছর খুব ভালো কাটেনি লণ্ডনে। যদিও বেশিদিন অপেক্ষাও করতে হয়নি তাঁকে। ২০০০ এর শুরু থেকে আর্সেনালের ফুটবলে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন তিনি, তা জন্ম দিয়েছিল সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রিমিয়ার লিগ দলের, যারা পরিচিত হয়েছিল 'Invincibles', অপরাজিত নামে। এবং আর্সেন ওয়েঙ্গার 'প্রফেসর' নিজের স্থান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ফুটবলের ইতিহাসে। 


২০০১-০২ সিজনে আর্সেনাল একটিও অ্যাওয়ে ম্যাচে হারেনি, যা প্রিমিয়ার লিগের বিগত ১০০ বছরের ইতিহাসে কখনও ঘটেনি। তারাই প্রথম টিম ছিল যারা লিগের ৩৮ ম্যাচের প্রত্যেকটিতে গোল করতে সক্ষম হয়েছিল। এসময়েই ব্রিটিশ সংবাদপত্র আর্সেনালকে 'Invincibles' তকমা দেয়, যা প্রকৃত অর্থে সত্যি হয়ে ওঠে কয়েক বছর পরেই, যখন প্রেস্টন নর্থ এন্ড ক্লাবের কীর্তির প্রায় ১০০ বছর পর দ্বিতীয় দল হিসেবে ২০০৩-০৪ সিজনে পুরো সিজনে একটিও ম্যাচ না হেরে প্রিমিয়ার লিগ ট্রফি ঘরে তোলে আর্সেনাল। আর এ সাফল্যের পুরোধা ছিলেন একমেবাদ্বিতীয়ম আর্সেন ওয়েঙ্গার! 

আর্সেনালের অপরাজেয় হয়ে ওঠার যাত্রা শুরু হয়েছিল আর্সেন ওয়েঙ্গারের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মাধ্যমে। ইংলিশ ফুটবলে তিনিই প্রথম খেলার পাশাপাশি ডায়েট এবং নিউট্রিশনে জোর দেন। এছাড়াও ট্রেনিংয়ে শুধুমাত্র দৌড় ছাড়াও স্টপওয়াচের ব্যবহার, পাসিং ট্রেনিংয়ের সূত্রপাত করেছিলেন তিনি। মদ্যপানে কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন আর্সেন। এছাড়াও, দল তৈরির ক্ষেত্রে বেশি টাকা খরচে বিশ্বাস করতেন না আর্সেন। ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে কোনও প্লেয়ারের থেকে তাঁর সেরাটা বের করে আনতে ভীষণ দক্ষ ছিলেন তিনি। এই উদ্দেশ্যে ২০০৩-০৪ সিজন শুরুর আগে শুধুমাত্র গোলকিপার ডেভিড সিমেনকে ছেড়ে দিলেন আর্সেন। ডর্টমুন্ড থেকে গোলকিপার ইয়েঞ্জ লেহম্যান, সেভিয়া থেকে উইঙ্গার হোসে আন্তোনিও রেয়েস, এবং এএস ক্যান থেকে গেল ক্লিশিকে মূল দলে খেলানোর জন্য সই করালেন তিনি। 

প্রাথমিকভাবে তৎকালীন ব্রিটিশ ট্র্যাডিশনাল ৪-৪-২ ফর্মেশন অনুযায়ী প্রথম দল তৈরি করলেন আর্সেন। গোলে লেহম্যান, সেন্টার ব্যাক হিসেবে কোলো তুরে, সল ক্যাম্পবেল। দুই হাফব্যাক লরেন এবং অ্যাশলে কোল। 
মিডফিল্ডের মিডল করিডরে থাকতেন ক্যাপ্টেন প্যাট্রিক ভিয়েরা এবং গিলবার্তো সিলভা। একটু ওয়াইডে রবার্তো পিরেস এবং ফ্রেডি লুংবার্গ। এবং অবশেষে, অ্যাটাকে অন্যতম সেরা দ্বয়ী ডেনিস বার্গক্যাম্প এবং থিয়েরি অঁরি। 

এই দলের বিল্ড আপ প্লে-এর ক্ষেত্রে মূল চাবিকাঠি ছিল মাঠের প্রেক্ষিতে উল্লম্বভাবে কিংবা অনুভূমিকভাবে দ্রুত বল নিয়ে মুভ তৈরি করা। লেহম্যানের দ্রুত বল ডিস্ট্রিবিউশন ও রিলিজ পৌঁছে যেত সেন্টার ব্যাকেদের কাছে। মূলত কোলো তুরে ডিফেন্স লাইন থেকে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের কাছে বল চ্যানেল করে দেওয়া বা করিডোর তৈরি– এগুলি অনফিল্ড সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতেন। গিলবার্তো সিলভা ডিপ ড্রপ করে আরও ভালো পাসিং অ্যাঙ্গেল এবং স্পেস তৈরি করতেন, একইসাথে বার্গক্যাম্পের ড্রপ করা আর্সেনালকে ৪-২-৩-১ হিসেবে অপারেট করতেও প্রভূত সাহায্য করতো। এই প্রসেসকে 'Staggering the line' বলা হয়, যেখানে ডিফেন্স, মিডফিল্ড এবং অ্যাটাক এই তিনটি লাইনের মাঝেও নিজেদের প্লেয়ারকে দ্রুত আনা যায় যাতে প্রতিপক্ষের প্রেসকে যত দ্রুত সম্ভব সামলে নেওয়া যায়। নিজেদের প্রেস তৈরির ক্ষেত্রে, ভিয়েরা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে হাইপ্রেসে অংশগ্রহণ কম করে গিলবার্তোর সাথে মিডফিল্ডে 3v2 পরিস্থিতি তৈরি করে নিতেন। ফলে মিডফিল্ডে কর্তৃত্ব বজায় থাকতো। একমাত্র সেন্ট্রাল অ্যাটাকের ক্ষেত্রে অঁরি হাইপ্রেস করে প্রতিপক্ষকে নিজের দিকে টেনে নিতেন, এবং ভিয়েরা বার্গক্যাম্পের সাথে প্রেস করে 'Numerical Supremacy' তৈরি করতেন। প্রতিপক্ষ হাইপ্রেস না করলে কখনও কখনও কোলো তুরে এগিয়ে এসে মিডফিল্ডে অপশন বাড়িয়ে দিতেন। বাঁদিকের হাফস্পেস গুলিতে ড্রিফট-ইন করে অ্যাটাক করতেন রবার্ট পিরেস, যা লেফট ফ্ল্যাঙ্কে 4v2 পরিস্থিতি তৈরি করতো। এবং অ্যাশলে কোল বাঁদিকের ওয়াইড স্পেস ব্যবহার করতে পারতেন। ডানদিকে লরেন বেশি উঠতেন না, লুংবার্গ রাইট ফ্ল্যাঙ্কে অপারেট করতেন। এইভাবে দুইদিক থেকে অ্যাটাক তৈরির ক্ষেত্রে ভিয়েরা 'Trigger player' হিসেবে প্রতিপক্ষের বক্সের দিকে রান নিতেন। একইভাবে প্রতিপক্ষ ওয়াইড খেললে মিডফিল্ড থেকে উইংয়ে বল সাপ্লাই ও একইভাবে ট্রিগার রান তৈরি করে অ্যাটাক বিল্ডআপ করতো আর্সেনাল। ব্যাক ফোর অর্থাৎ ডিফেন্স লাইন নিজেদের শেপ থেকে কদাচিৎ সরে আসতো। এছাড়াও ওয়ান-ওয়ান পরিস্থিতিতে বল জেতায় গুরুত্ব দিয়েছিলেন আর্সেন।

 

২০০২-০৩ সিজনের শুরুতে আর্সেন ওয়েঙ্গার সংবাদমাধ্যমে করেছিলেন সেই অবিস্মরণীয় উক্তি– "It's not impossible to go through the season unbeaten and I can't see why it's shocking to say that." 

যথারীতি ব্রিটিশ মিডিয়ার কাছে তাঁর এই উক্তি ব্যঙ্গের কারণ হয়ে ওঠে। আগুনে ঘৃতাহুতি দেয়, সেই সিজনে আর্সেনালের ছয়টি ম্যাচ হেরে লিগে দ্বিতীয় হওয়া। কিন্তু তার একটি সিজন পরেই ২০০৩-০৪ সিজনে মোট ৭৩ গোল করে, ৩৮ টি ম্যাচের মধ্যে ২৬ জয়, ১২ ড্র এবং মোট ৯০ পয়েন্টের রেকর্ড নিয়ে অসাধ্যসাধন করে আর্সেন ওয়েঙ্গারের প্রশিক্ষণাধীন আর্সেনাল। তাঁদের এই সাফল্যকে পূর্ণ মর্যাদা দিতে ব্রিটিশ এফএ 'Golden premier league trophy' নামে একটি স্বর্ণখচিত ট্রফি দিয়ে সম্মানিত করে আর্সেনালকে, যা এখনও একটি দুর্দান্ত রেকর্ড। 

লেস্টার সিটির বিরুদ্ধে ২-১ জিতে অপরাজেয় থেকে লিগ জেতা নিশ্চিত করে ফেলার পর স্পোর্টসরাইটার কেভিন মিচেল আর্সেন ওয়েঙ্গার সম্পর্কে লিখেছিলেন– "probably all of football at the moment." 

আর নিজের টিম সম্পর্কে প্রফেসর বলেছিলেন– "To remain unbeaten in a championship like the English championship now is really unbelievable. I want to win the Champions League but, really, this is more important. It is something amazing, something special. How can you do it?"


Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

যুদ্ধক্ষেত্রের ফুল

নেপলসের প্রেমিক

"This could be today, Grandma!"