দল-বদলের গল্প

দল-বদল বা ট্রান্সফার ফুটবলবিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। সিজন শুরু হওয়ার পর মাঠের লড়াইয়ের আগেই, ক্লাবগুলির মধ্যে টক্কর শুরু হয়ে যায় বিভিন্ন খেলোয়াড়কে সই করানোর জন্য। মূলত ট্রান্সফার উইন্ডো থেকে কাঙ্খিত সাফল্যলাভের ব্লুপ্রিন্ট তৈরি শুরু হয়ে যায়– যার পেছনে থাকে অসংখ্য জটিল 'Negotiation', 'Agreement', 'Pre-agreement' ইত্যাদি। ট্রান্সফার মার্কেটে নিয়মমাফিক প্রচুর ট্রান্সফার সম্পন্ন হয়। কিন্তু দলবদলের এমন কিছু গল্পও থাকে, যেগুলো একইসাথে হাস্যকর, অভিঘাতপূর্ণ, অবাক করে দেওয়ার মতো। তেমন কিছু গল্প বলার প্রয়াস রইল এখানে।  

দিদিয়ের দ্রোগবা 

২০০৪ সালে চেলসি কোচের হটসিটে বসেন হোসে মৌরিনহো। সদ্য এফসি পোর্তোকে চ্যাম্পিয়নস লীগ জেতানো মৌরিনহো তাঁর নতুন দলের জন্য খুঁজছিলেন একজন ভালো স্ট্রাইকার। তাঁর জহুরির চোখ চিনে নেয় ২০০৩-০৪ সিজনের ফ্রেঞ্চ লিগ ওয়ানের প্লেয়ার অফ দ্য সিজন, অলিম্পিক দে মার্সেইয়ের স্ট্রাইকার দিদিয়ের দ্রোগবাকে। বেইন স্পোর্টসে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি প্রকাশ করেছিলেন চেলসির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাইনিংয়ের গল্প। 

তৎকালীন চেলসি মালিক রোমান আব্রামোভিচ এবং হোসে মৌরিনহো একটি রেস্তরাঁয় মিটিংয়ে বসেছিলেন। দ্রোগবার প্রসঙ্গ তুললে, রোমান তাকে ঠিক চিনতে পারেননি। স্বাভাবিকভাবেই তিনি জানতে চেয়েছিলেন কার জন্য তিনি ট্রান্সফার ফি পেমেন্ট করতে চলেছেন। রোমান প্রশ্ন করেছিলেন– “Who? Who do you want as a striker?... Who is he? Where’s he playing?”

যার উত্তরে হোসে বলেছিলেন– “Mr Abramovich, pay. Pay, and don’t speak.”

তাঁর সাইনিং ভুল প্রমাণিত হয়নি একেবারেই। ২৪ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে চেলসিতে সই করেন দ্রোগবা। ২০১২ সাল পর্যন্ত খেলে, ১৫৭ গোল করে চেলসির অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্ট্রাইকার হিসেবে নিজের নাম খোদিত করেছিলেন ক্লাবের ইতিহাসে। প্রথম সিজনেই প্রিমিয়ার লিগ জিতেছিলেন তিনি এবং পরবর্তীতে আরও তিনটি প্রিমিয়ার লিগ, চারটি লিগ কাপ ও একটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছিলেন দ্রোগবা। 

• ম্যালকম অলিভিয়েরা 

২০১৮ সালে ফ্রেঞ্চ ক্লাব বোর্দোর স্টার প্লেয়ার ম্যালকম এএস রোমা ক্লাবে ট্রান্সফারের জন্য প্রয়োজনীয় এগ্রিমেন্ট সেরে ফেলেছিলেন। বোর্দোও রাজি ছিল তাঁদের এগ্রিমেন্টে, এমনকী তাঁরা ইতালির উদ্দেশে রওনা দেওয়ার জন্য ফ্লাইটও বুক করে ফেলেছিলেন। টুইটারে নজর রেখে দেখা যাচ্ছিল, রোমের এয়ারপোর্টে রোমার ফ্যানরা তাঁকে অভ্যর্থনা করার জন্য অপেক্ষা করে আছেন।

যদিও পাশার দান উল্টে যায় মুহূর্তেই। ট্রান্সফার মার্কেটের অতিপরিচিত 'Eleventh Hour' এ এফসি বার্সেলোনা বোর্দোর সাথে ট্রান্সফার নেগোশিয়েশন শুরু করে। তাঁরা রোমার অফার করা ফিজের থেকে বেশি ফিজ অফার করেন এবং ম্যালকমের অনুমতিসাপেক্ষে তিনি সই করেন স্পেনের ক্লাবটির হয়ে। ফুটবলে শেষমুহূর্তে এমন 'Transfer Hijacking' এর ঘটনা বিরল। 

৪১ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে ম্যালকম বার্সেলোনায় পাঁচ বছরের জন্য সই করেছিলেন। যদিও এই ট্রান্সফার আশানুরূপ হয়নি। মাত্র একটি সিজন খেলেই ম্যালকমকে রাশিয়ার জেনিট এসপির কাছে বিক্রি করে দেয় বার্সেলোনা। ২৪ টি ম্যাচ খেলে মাত্র ৪ গোল ও ২ টি অ্যাসিস্ট করতে পেরেছিলেন তিনি। 

• ইম্যানুয়েল পেটি

১৯৯৭ সালের ট্রান্সফার উইন্ডোতে অন্যতম 'demanded' প্লেয়ার ছিলেন এএস মোনাকো ক্যাপ্টেন, ইম্যানুয়েল পেটি। সুদক্ষ এই মিডফিল্ডারকে সই করানোর দৌড়ে সবথেকে এগিয়ে ছিল নর্থ লন্ডনের ক্লাব 'স্পার্স' তথা, টটেনহ্যাম হটস্পার। তৎকালীন টটেনহ্যাম চেয়ারম্যান অ্যালান শুগারের সাথে একটি প্রিলিমিনারি মিটিংয়ে আসেন। ক্লাবের তরফে তাঁকে স্টেডিয়ামও ঘুরিয়ে দেখানো হয়। এবার শুধু সই করার অপেক্ষা, ভেবেছিলেন স্পার্স কর্তারা। ক্লাব থেকে বেরোনোর সময় পেটি ক্লাব কর্তাদের বলে একটি ট্যাক্সি বুক করান। হয়তো তিনি এয়ারপোর্টে ফিরে যাচ্ছেন, এই ভেবে কর্তারা ট্যাক্সির ব্যবস্থা করে দেন। শোনা যায়, ট্যাক্সির ২০ পাউন্ড ভাড়াও তাঁরাই দিয়েছিলেন। 

কিন্তু পেটি পৌঁছে যান হাইবেরিতে, স্পার্স দলের বৃহত্তম রাইভ্যাল আর্সেনাল ক্লাবে; তৎকালীন আর্সেনাল চেয়ারম্যান ডেভিড ডিন এবং কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গারের সাথে দেখা করতে। মোনাকো থেকেই পূর্বপরিচিত ওয়েঙ্গার পেটিকে আর্সেনালে সই করার জন্য রাজি করাতে সমর্থ হন, এমনকী পেটি সেদিন দুপুরেই আর্সেনালে সই করেন। 

পরবর্তীতে পেটি টটেনহ্যাম কর্তাদের ট্যাক্সি ভাড়া দেওয়ার প্রসঙ্গে মজা করে বলেছিলেন– “If they want to send me the bill I am happy to pay it,”

• ডেভিড দে হেয়া, কেলর নাভাস

২০১৫ সালে রিয়াল মাদ্রিদ এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড একটি 'Swap deal agreement' করেছিল। রিয়াল মাদ্রিদের তৎকালীন গোলকিপার কেলর নাভাস এবং ইউনাইটেড কিপার ডেভিড দে হেয়া যুক্ত ছিলেন এই ট্রান্সফারে, যথাক্রমে যাদের গন্তব্য ছিল ইউনাইটেড এবং মাদ্রিদ। সবকিছু ঠিক ছিল, কিন্তু বাদ সাধল একটি ফ্যাক্স মেশিন। ফুটবলের অন্যতম জনপ্রিয় 'conspiracy theory' হল এই ঘটনা যেখানে কিছু সূত্র দাবি করেছিল, 'deadline day' তে নাভাসের ডকুমেন্টেশন সঠিক সময়ে ক্লাবে পৌঁছয়নি। যার জন্য দায়ী একটি ত্রুটিপূর্ণ ফ্যাক্স মেশিন! কোনও ডকুমেন্টই নির্দিষ্ট সময়ের আগে জমা করা যায়নি, ফলে প্লেয়ারদের রেজিস্ট্রেশনও সম্পন্ন হয়নি। ইংল্যান্ডে ডেডলাইন ডে-এর পরেও কিছু নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত ট্রান্সফার রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করা যায়। কিন্তু স্পেনে এমন কোনও সুবিধা ছিল না। ফলে ট্রান্সফারটি সম্পূর্ণ হয়নি। আগুনে ঘৃতাহুতি হিসেবে দুই ক্লাবই এক অপরকে দোষারোপ করে এবং ট্রান্সফার না হওয়ার কারণ হিসেবে পরস্পরবিরোধী বিবৃতি প্রকাশ করে। 

হতাশ নাভাস এই অসফল ট্রান্সফার সম্পর্কে বলেছিলেন– “I cried when the transfer window was closed, near my wife... I’m human and everything exploded. I was waiting in the airport even without suitcases. I was not on the plane, but I was near.”

• নেইমার

২০১৭ সালের ট্রান্সফার উইন্ডোর শুরু থেকেই ভালো দল তৈরির উদ্দেশ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল প্যারিস সাঁ জারমাঁ। এফসি বার্সেলোনায় ২০১৩ সালে সই করা নেইমার তখন তাঁর ফর্মের তুঙ্গে। ক্লাবের হয়ে দুটি লালিগা জয়ের পাশাপাশি একটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতায় তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। বার্সেলোনায় লিওনেল মেসির উত্তরসূরী হিসেবে নেইমারকে নিয়েই স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন তামাম বার্সা ফ্যানরা। 

২০১৭ এর ১৮ জুলাই তারিখে প্রথম প্রকাশ পাওয়া তথাকথিত গুজবটি সত্যি না হওয়া পর্যন্ত কেউ বিশ্বাস করতে পারেনি, নেইমার বার্সেলোনা ছেড়ে সত্যিই সই করছেন পিএসজিতে। স্প্যানিশ জায়ান্ট হিসেবে রিয়াল মাদ্রিদ এবং বার্সেলোনা বরাবর ডমিনেট করতো ট্রান্সফার মার্কেট। কিন্তু এবার তার এক বৃহৎ পরিবর্তন হল। ২০১৬ সালের নভেম্বরেই বার্সেলোনার সাথে 'contract renewal' সই করেছিলেন নেইমার। তবুও ২০১৭ আগস্টের উইন্ডোতে নেইমারের 'entourage' পিএসজি প্রেসিডেন্ট নাসের আল খেলাইফিকে একটি ফোনকলের মাধ্যমে জানায়, নেইমার বার্সেলোনা ছাড়তে প্রস্তুত। নেইমারের সাথে গোপন আলোচনার মাধ্যমে 'personal terms agreement' ও সেরে ফেলেছিলেন পিএসজি কর্তারা। অবশেষে তিন সপ্তাহ ধরে বার্সেলোনার কর্তাদের সাথে নেগোশিয়েশন, আলোচনার পর নেইমারকে সই করাতে বার্সেলোনাকে ২২০ মিলিয়ন পাউন্ডের রিলিজ ক্লজ পে করেছিল পিএসজি, যা এখনও পর্যন্ত সর্বকালীন ট্রান্সফার রেকর্ড! 

এই সাইনিং অন্যতম 'shocking signing' হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল, যা ট্রান্সফার মার্কেটে 'cash splash' এর ধারণাকে বদলে দিয়েছিল পুরোপুরি। এই ট্রান্সফার থেকেই খেলোয়াড়দের জন্য বিরাট অঙ্কের অর্থ দেওয়ার চল শুরু হয় যা বদলে দিয়েছে ফুটবলের টেকনিক্যাল মানচিত্র। 

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

"This could be today, Grandma!"

নেপলসের প্রেমিক

আর্সেনাল: 'দ্যা ইনভিন্সিবলস'