স্বৈরাচারকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন যিনি
১
সকালের ঘুম ভেঙে তখন ধীরে ধীরে জেগে উঠছে ভিয়েনা শহর। জানুয়ারির ঠাণ্ডায় আলস্য জড়িয়ে রেখেছে গোটা অস্ট্রিয়াকে। তখনও বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়নি। যুদ্ধের আতঙ্ক গ্রাস করতে পারেনি মানুষকে।
১৯৩৯ সালের ২৯ জানুয়ারির এমন এক অতিসাধারণ সকালবেলায় গুস্তাভ হার্টম্যান নামক এক যুবক খুবই চিন্তিত হয়ে হাঁটছিলেন রাস্তায়। দেখা করতে এসেছিলেন এক বন্ধুর সঙ্গে। কিন্তু সেই বন্ধুকে অত সকালেও তাঁর বাড়িতে দেখতে পাননি গুস্তাভ। তাই কিছুটা ভয় পেয়ে তৎক্ষণাৎ বন্ধুকে খুঁজতে বেরিয়েছেন। কোথায় থাকতে পারেন, কী ব্যাপার– এসব কথা ভাবতে ভাবতে একটা জায়গার কথা মনে হলো তাঁর। সময় নষ্ট না করে সে পথে পা বাড়ালেন গুস্তাভ।
ভিয়েনার একটি শান্ত জনপদ অ্যানাগেজ। সেখানের একটি ফ্ল্যাটের সামনে এসে দাঁড়ালেন গুস্তাভ। অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে, অবশেষে বাধ্য হয়েই দরজা ভেঙে ঢোকেন সেখানে। ঢুকে যা দেখলেন, তা একইসাথে দুঃখজনক এবং দুশ্চিন্তা-উদ্রেককারী।
নগ্ন অবস্থায় পড়ে আছেন তাঁর বন্ধু ম্যাথিয়াস সিন্ডেলার। পাশে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকা মেয়েটিকেও চিনতে পারেন গুস্তাভ। ক্যামিয়া ক্যাস্টিনোলা। মাত্র ৯-১০ দিন আগেই ম্যাথিয়াস যাঁকে পরিচয় করিয়েছিলেন নিজের প্রেমিকা হিসেবে।
দেহ আবিষ্কার করার সময়, ম্যাথিয়াস ততক্ষণে মৃত। তাঁর প্রেমিকাকে হসপিটালে নিয়ে গেলেও বাঁচানো গেলো না তাঁকেও। পুলিশ দু-দিনের মধ্যে তদন্ত বন্ধ করে দিল। পোস্টমর্টেম রিপোর্টে লেখা হলো– "Asphyxiation by Carbon Monoxide."
২
এতটুকু পড়ে পাঠক হয়তো ভাবছেন, এটি নির্ঘাত কোনও রহস্যগল্প, ডিটেকটিভ স্টোরি। কিন্তু তা একেবারেই নয়। অস্ট্রিয়ার তৎকালীন ফুটবল তথা সামাজিক ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যাওয়া যে ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল জনমানসের সামাজিক বা গণতান্ত্রিক ভিত্তি, তা একেবারেই নিরীহ কোনও ফিকশন নয়। বাস্তবের মাটিতে ঘটে যাওয়া চূড়ান্ত, বিষম সত্য।
ম্যাথিয়াস সিন্ডেলার। পেশায় ছিলেন, ফুটবলার। যদিও এটুকু পরিচয়ে তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনকাল ও তাঁর অনন্যসাহসী ধ্যানধারণাকে প্রতিষ্ঠা দেওয়া অসম্ভব। দারুণ স্কিল-ই শুধু নয়, তাঁর চিন্তাসমৃদ্ধ খেলার ধরণ তাঁকে আলাদা করেছিল সমসাময়িক খেলোয়াড়দের থেকে। ইউরোপের 'কফিহাউস সংস্কৃতি'-র বুদ্ধিজীবী, থেকে 'ব্লু-কলার' সমর্থকগোষ্ঠী– সমাজের নানা স্তরের এক বিরাট অংশের পছন্দের খেলোয়াড় ছিলেন সিন্ডেলার, যাঁর ডাকনাম ছিল 'Der Papierene' বা 'The Paper Man'। কেউ কেউ তাঁকে আখ্যায়িত করেছিলেন 'Mozart Of Football' নামে।
মূলত সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলা সিন্ডেলার FK Austria Vienna ক্লাবের হয়ে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন। তুখোড় ড্রিবলিং, ট্যাকটিক্যাল প্লে-র সাহায্যে ১৯২০ ও ১৯৩০ এর দশকে বহুবার দলকে অস্ট্রিয়ান কাপ জিততে সাহায্য করেছিলেন। অথচ, সমসময়ের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে তাঁকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল অস্ট্রিয়া ন্যাশনাল টিম এবং দেশের হয়ে তাঁর পারফরম্যান্স।
১৯২৬ সালে অস্ট্রিয়ার হয়ে তাঁর ডেবিউ হয়। অভিষেক ম্যাচেই গোল করেছিলেন সিন্ডেলার। যদিও অস্ট্রিয়া ন্যাশনাল টিমের 'Wunderteam' নামে বিখ্যাত হয়ে ওঠার যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৩১ সালে– তৎকালীন ইউরোপিয়ান ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দল স্কটল্যান্ডকে ৫-০ গোল ধূলিস্যাৎ করে। এই জয়ের মাধ্যমেই শুরু হয় অস্ট্রিয়ার একাধিপত্য। পরবর্তী কিছু বছরে অস্ট্রিয়া টিম যা করে দেখিয়েছিল তা সমকালীন ফুটবলবিশ্বের কাছে রীতিমত বিস্ময়ের সমস্ত পর্যায় পার করে গিয়েছিল। জার্মানিকে ৬-০, সুইটজারল্যান্ডকে ৮-১, হাঙ্গেরিকে ৮-২, ফ্রান্সকে ৪-০ গোলে চূর্ণ করেছিল অস্ট্রিয়া। ১৯৩০ এর দশকের শুরুর দিকে, তর্কাতীতভাবে অস্ট্রিয়া হয়ে উঠছিল বিশ্বের সেরা দল এবং বলাই বাহুল্য, ম্যাথিয়াস সিন্ডেলার ছিলেন তাঁদের নয়নের মণি।
৩
ফুটবলার হিসেবে তিনি একজন জিনিয়াস তো ছিলেন নিঃসন্দেহে। অস্ট্রিয়ার ফুটবলের একজন আইকন হিসেবে তিনি কখনওই লুকিয়ে রাখেননি তাঁর সামাজিক ও গণতান্ত্রিক অবস্থান। বরাবর বিরোধিতা করেছেন স্বৈরাচারিতার, ইউরোপে ঘটে চলে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন। যদিও নাৎজি শাসনের সাথে সিন্ডেলারের সরাসরি সংঘাত শুরু হয়েছিল আগেই, যার অন্তিম ফলাফল তাঁর ছিল দুঃখজনক মৃত্যু।
১৯৩৮ সালের ১২ মার্চ অ্যাডলফ হিটলারের নাৎজি বাহিনী অস্ট্রিয়া অধিগ্রহণ করে 'Anschluss' কায়েম করে। অস্ট্রিয়ান ন্যাশনাল ফুটবল টিমকে ভেঙে জার্মানির দলে যুক্ত করার প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে যায়। যদিও তার আগে ঠিক হয়, অস্ট্রিয়া ও জার্মানির একটি শেষ ফ্রেন্ডলি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। ৩ এপ্রিল, ১৯৩৮ এ অনুষ্ঠিত হওয়া এই ম্যাচ এখনও অবধি ফুটবলের সাথে রাজনীতি, সমাজ অঙ্গাঙ্গীভাবে মিশে যাওয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হয়ে আছে।
শেষবারের মতো মাঠে নামে 'Wunderteam'। নাৎজিদের কড়া নির্দেশ ছিল, কোনওভাবেই জার্মানিকে হারানো চলবে না। সিন্ডেলার সে নির্দেশকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দেননি। ফার্স্ট হাফ গোলশূন্য কাটলেও প্রচুর সুযোগ মিস করেছিল অস্ট্রিয়া এবং সিন্ডেলার স্বয়ং। পরদিনের কিছু সংবাদপত্রের পাতায় যার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছিল, সিন্ডেলার স্বতঃপ্রণোদিতভাবে গোল মিস করে জার্মানদের ব্যঙ্গ করেছিলেন। জার্মান দলের সাথে আক্ষরিক অর্থেই ছেলেখেলা করেছিলেন তিনি। দ্বিতীয় হাফের সত্তর মিনিটের মাথায় রিবাউন্ড থেকে গোল করেন ম্যাথিয়াস সিন্ডেলার। ম্যাচের প্রায় শেষের দিকে শ্যাস্তি সেস্তার ফ্রিকিক জার্মানির জালে জড়িয়ে যেতেই সিন্ডেলার গোলের উৎসব করতে ছুটে গিয়েছিলেন গ্যালারির দিকে একটি নির্দিষ্ট কোনায়– যেখানে আসীন ছিলেন উচ্চপদস্থ নাৎজি আধিকারিকরা। নীরব প্রতিবাদের ভাষা আছড়ে পড়েছিল তাঁদের মুখের ওপর, যখন পরাধীন অস্ট্রিয়া ২-০ গোলে হারিয়ে দিয়েছিল স্বৈরাচারী জার্মানিকে। এরপরেও বিভিন্নবার সিন্ডেলারকে জার্মানির তরফ থেকে তাঁদের হয়ে খেলার প্রস্তাব দেওয়া হলেও প্রতিবারই তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তিনি। ১৯৩৮ সালের আগস্টে, স্বৈরাচারী নাৎজিদের চাপিয়ে দেওয়া কিছু নিয়মের জন্য লিওপল্ড ড্রিল নামক একজন ইহুদি বাধ্য হয়েছিলেন তাঁর ক্যাফেটি বিক্রি করে দিতে। সেটিকে কিনেছিলেন সিন্ডেলার। ইহুদিদের প্রতি তাঁর সহানুভূতিশীল ব্যবহারও ভালো চোখে নেয়নি নাৎজিরা।
৪
নৃশংসতম নাৎজিদের সাথে এমন সরাসরি সংঘর্ষের পরিণতি কী হয়েছিল– তা লিখেছি আগেই। তাঁর মৃত্যুর দু-দিন পর, ২৫ জানুয়ারি অস্ট্রিয়ান সংবাদপত্র 'Kronen Zeitung' একটি কলামে দাবি করে– "everything points towards this great man having become the victim of murder through poisoning"। এছাড়াও, "Gedicht vom Tode eines Fussballers" ("Ballad on the Death of a Footballer") এর লেখক ফ্রেইডরিখ টরবার্গ তাঁর মৃত্যুকে ব্যাখ্যা করেছিলেন "suicide by a man who felt 'disowned' by the new order" হিসেবে। শোনা যায়, দু-দিনের মধ্যে তদন্ত বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি ছয় মাসের মাথায় কোনও সমাধানসূত্র ছাড়াই কেস ক্লোজ করে দেওয়ার আদেশ দিয়েছিল হিটলারের গোপন পুলিশবাহিনী, গেস্টাপো। ত্রুটিপূর্ণ একটি হিটার থেকে গ্যাস ছড়িয়ে অ্যাক্সিডেন্টেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে এমন তথ্যের পাশাপাশি উঠে আসে গেস্টাপোর দ্বারা তাঁর খুনের চক্রান্ত হয়েছিল, এমন দাবিও। অথচ তাঁর মৃত্যুরহস্যের তদন্তের কোনও পুলিশি ডকুমেন্টই হারিয়ে যায়নি বা নষ্ট করা হয়নি! রহস্যের ঘেরাটোপেই হারিয়ে যায় এক অসাধারণ ফুটবলারের পাশাপাশি আরও অসামান্য, সাহসী এক মানুষের দুঃখজনক মৃত্যুর আসল কারণ।
থিয়েটার সমালোচক আলফ্রেড পোলগার সিন্ডেলারের 'Obituary' তে লিখেছিলেন– "The good Sindelar followed the city, whose child and pride he was, to its death. He was so inextricably entwined with it that he had to die when it did. All the evidence points to suicide prompted by loyalty to his homeland. For to live and play football in the downtrodden, broken, tormented city meant deceiving Vienna with a repulsive spectre of itself... But how can one play football like that? And live, when a life without football is nothing?"
Besh laglo
ReplyDeleteThanks ♥️
DeleteNice bhai..
ReplyDeleteThanks ♥️
DeleteAre bhai darun!!!
ReplyDeleteThanks ♥️
DeleteMarattok hoyeche
ReplyDeleteThanks ♥️
DeleteAs usual great
ReplyDeleteThanks ♥️
DeleteWow it’s informative
ReplyDeleteThanks ♥️
DeleteBest 👍
ReplyDeleteThanks ♥️
Delete