মেসি, তোমার জন্য

রোজারিওর সেই ছোট্ট ছেলেটার সাথে প্রথম ঠিক কবে পরিচয় হয়েছিল, আজ আর মনে পড়ে না। শুধু মনে পড়ে– দু'হাজার তেরোর শেষপ্রান্তে এসে, রোজারিও থেকে বহুদূরের কোনও দেশে দাঁড়িয়ে ফুটবলের ওমে সবেমাত্র স্নান করে নিচ্ছে রোগা একটি ছেলে এবং তার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে দশ নম্বরি একটি জার্সি। বার্সেলোনার নীল-লাল  স্ট্রাইপের, পিঠে উজ্জ্বল তার নাম। মেসি। লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। বার্সেলোনা, মেসি, আর্জেন্টিনা। চেনা এ কক্ষপথে সঙ্গী হওয়া হয়তো অস্বাভাবিক কিছু নয়। ফুটবল দেখার পরিধি আরও বৃদ্ধি পায়। মা বলেন, এ কী পাগলামি! মেসি ছুটে বেড়াচ্ছেন স্পেনীয় বিকেলে, রাতে। ছুটে বেড়াচ্ছেন ইউরোপিয়ান সার্কিটে। খবরের কাগজের কাটিংয়ে তার ছবি। জমিয়ে রাখতে রাখতে যা হারিয়ে একদিন গেলেও, স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থেকে যায় আজীবন। 
                
                 এভাবে আসে দু'হাজার চোদ্দ'র ব্রাজিল। মাঠে আর্জেন্টিনা।  অথচ দু'চোখ শুধু খুঁজে বেড়াচ্ছে তাকে, চিরায়ত দশ নম্বর। প্রথম ম্যাচে বসনিয়া, দ্বিতীয়ে ইরানের সাথে শেষমুহূর্তে ভেসে ওঠা। একেকটি ধাপ পার হয়। স্বপ্ন দেখতে শিখি। স্বপ্ন ভেঙেও যায়। ফুটবল উপহার দেয় প্রথমবার হৃদয় ভাঙার অনন্য অনুভূতি। বিশ্বকাপের দিকে শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বিপরীত দিকে চলে যাওয়া লিওনেল মেসি যেন ঠিক তখনই নেমে আসেন মাটিতে। ঈশ্বর বা ভিনগ্রহী নন, তিনি হয়ে ওঠেন মানুষ। যাঁর স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গ আমাদের মতোই বিষাদগ্রস্ত। "Sometimes, you have to accept you can’t win all the time."

                
            কী শিখলে? হেরে যাওয়া? মানুষটা কি হাল ছেড়ে দেবে আদৌ? না, দেবে না। বছর বারোর কিশোর পেয়ে গেল জীবনের কঠিনতম প্রশ্নের সহজতম উত্তর। অথচ ফিরে আসে দু'হাজার পনেরো, দু'হাজার ষোলো। কোপা আমেরিকার দুটো ফাইনালে পরপর একই প্রতিপক্ষের কাছে নতিস্বীকার। বছর চোদ্দ-র কিশোর দেখতে পাচ্ছে তার আদর্শ, তার প্রিয় ফুটবলারের কান্নায় ভেঙে পড়া। তাকে ভয় দেখায় ব্যর্থতার স্বাদ। তাহলে কি মিথ্যে হবে সকল চেষ্টা? 
                 
                 আন্তরিক কিছু চেষ্টা হয়তো মিথ্যে হয় না। কিছু বিশ্বাসের পিঠে নীরবে হাত রাখেন লিওনেল মেসির মতো কেউ। বলেন, "You can overcome anything, if and if only you love something enough." ভালবাসার কাছে সমস্ত ভয় তুচ্ছ। একারণেই আজও আশ্রয়হীন শিশু ফুটবল খেলতে এলে, তার শতচ্ছিন্ন জামার পিঠে লেখা থাকে মেসির নাম। যেসব রাতে তাদের পাশে কেউ থাকে না, লিওনেল মেসি এগিয়ে আসেন। এত ভাঙন সামলেও যাঁর চেহারায় লেগে থাকে নরম রোদের মত হাসি। একেকটি গোলে চূর্ণ করে দেন হাল ছেড়ে দেওয়ার সমস্ত ইচ্ছে। স্কুল থেকে কলেজ, শৈশব থেকে কৈশোর– জীবন এগিয়ে চলে, একই ছন্দে এগিয়ে চলেন লিওনেল মেসি। জীবনও তার ডাগআউট থেকে ধীরে ধীরে বের করে অস্ত্রসমূহ। প্রতিটা ড্রিবলিংয়ের আগে উড়ে আসে কড়া ট্যাকল। ছিটকে পড়ে মানুষ। আবার, একদিন ঠিক উঠে দাঁড়ায়। মেসি বলেন, ওঠো, হেরে যেয়ো না! বলেন, "I'm more worried about being a good person than being the best player in the world. When all this is over, what are you left with?" 
 
                 
                   লিওনেল মেসি শুধু একজন মানুষ নন। তাঁর দেহে থেকে যায় বিচ্ছেদের যন্ত্রণা। তাঁর ঐশ্বরিক বাঁ-পায়ের আমৃত্যু সঙ্গী হয়ে ওঠে শুধুমাত্র তাঁকে ভালোবেসে গড়ে ওঠা সমস্ত বন্ধুত্ব। যুবতীর দু'চোখে ভেসে বেড়ায় আনন্দাশ্রু। যে নম্বর থেকে অনেকদিন ফোন আসেনি, যোগাযোগ করে সে-ও। নিঃসাড়ে বলে, "আজ তুমি ঠিক জিতে গেলে!" এই আয়তক্ষেত্রাকার জমিতে মেসির মেয়াদ ফুরোলেও এমন যোগাযোগ মিথ্যে হবে না কোনওদিন। কারণ, এই স্মৃতি চিরন্তন। এই স্মৃতি, আমাদের পাথেয়। জীবনের সমস্ত সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে ভবিষ্যতের সেই যুবা অথবা বৃদ্ধ মানুষটি মনে রাখবে তার শৈশব। মনে রাখবে স্কুলে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগে সে প্রণাম করে যেত মেসির ছবি। আর এই উত্তরণের সঙ্গী হল বছর দুই আগেও নিজের ক্লাবে ব্রাত্য হয়ে থাকা এক গোলকিপার। কেরিয়ারের সায়াহ্নে এসে নিজের সেরাটুকু উজাড় করে দেওয়া এক ডিফেন্ডার। জীবন বাজি রেখে খেলতে নামা এক মিডফিল্ডার। বহু সুখদুঃখের সঙ্গী, শীর্ণকায় চেহারার একজন ফরোয়ার্ড। অথবা এক কমবয়সী কোচ। এমন ভেঙে যাওয়া তারার মত কিছু মানুষদের নিয়ে তবে শেষ হল অপেক্ষা, শুরু হল নতুন দৌড়।

                   এসব অদ্ভুত প্রলাপ লিখতে লিখতেও সে মনে মনে শ্রদ্ধা জানাবে সমস্ত ভালোবাসাকে। সে নিশ্চয়ই মনে রাখবে, বিশ্বকাপ ফাইনালে হেরে যাওয়ার আট বছর পর কীভাবে আরবদেশের মাটিতে জীবনের শেষ বিশ্বকাপেই মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিলেন লিওনেল মেসি। মেক্সিকো ম্যাচের গোল থেকে সেই যে দু'হাত ছড়িয়ে উড়তে শুরু করলেন তিনি, থামলেন না। তাঁর ক্ষতবিক্ষত ডানাদ্বয়ে হেরে যাওয়া প্রত্যেক যুদ্ধের চিহ্ন তাই বলে দেয়, ফিনিক্স পাখি এভাবেই একদিন উড়তে শেখে। ছাইয়ের স্তূপ থেকে উঠে এসে লিওনেল মেসি একদিন আমাদের উপহার দেন তাঁর ও আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠতম রাত। যে রাতে ছত্রিশটি বছর পর বিশ্বকাপ জিতে যায় আর্জেন্টিনা, জিতে যায় অপেক্ষা, বিশ্বাস, ভালোবাসা। এ রূপকথা নিজে হাতে লেখে রোজারিওর বালক। আর সুদূর কোনও এক দেশের কোনও এক ঘরে বসে বাকি জীবনে লড়াই করার সমস্ত রসদ সংগ্রহ করে রাখে বছর উনিশের কিশোর। প্রিয়তম ওয়ানরিপাবলিক ভাসিয়ে দেয় সুর... 

"I, I did it all
I owned every second that this world could give
I saw so many places
The things that I did
Yeah, with every broken bone
I swear I lived..." 

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

"This could be today, Grandma!"

নেপলসের প্রেমিক

আর্সেনাল: 'দ্যা ইনভিন্সিবলস'