নেপলসের প্রেমিক
বোধন
সময়টা ১৯৮৪ সাল।
চেহারায় খর্বকায় মানুষটি তখন খেলছেন স্পেনে, এফসি বার্সেলোনার জার্সিতে। চিরকাল রেবেল গোছের, নিজের মতে চলা খেলোয়াড়টির সাথে খুব একটা বনিবনা হতো না বার্সেলোনা বোর্ডের। এছাড়াও প্রচুর চোট-আঘাত পাওয়ার কারণেও বার্সেলোনা কর্তাদের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অযাচিত এক দায়। কন্ট্রাক্ট থাকলেও, সিজন শেষে তাঁর ক্লাব ছাড়া প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়।
আগুনে ঘৃতাহুতি দিল মাঠের একটি ঘটনা। অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের সাথে একটি ম্যাচ চলাকালীন জড়িয়ে পড়লেন বিপক্ষ খেলোয়াড় এবং সমর্থকদের সাথে মারামারিতে। বিলবাওয়ের মিগুয়েল সোলাকে আঘাত করে তিন মাসের ব্যান এলো তাঁর ওপরে। এমনকী নিজের দলের সমর্থকরাও তাঁর সমালোচনা থেকে রেহাই পেলেন না।
বাড়ছিল দূরত্ব। তিনি নিজেও ক্লাব ছাড়তে উদগ্রীব হয়ে উঠেছিলেন। ততদিনে অবশ্য নিজের তুখোড় ফুটবলীয় স্কিলের মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বের কাছে নিজেকে অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছিলেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই প্রচুর ক্লাবের অফারও ছিল তাঁর হাতে। অথচ, তিনি পাড়ি জমালেন সুদূর ইতালির দক্ষিণে, নেপলস শহরে। যে শহরের ক্লাব নাপোলির হয়ে খেলে তিনি অদূর ভবিষ্যতেই হয়ে উঠবেন মসীহা, যাঁকে নেপলসের মানুষ আক্ষরিক অর্থেই ভগবানের স্থানে আসীন করবে।
১৯৮৪ সালের জুলাই মাসে দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনাকে আপন করে নিল নেপলস। শুরু হল নাপোলির ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম এক অধ্যায়, যা ক্রমাগত ধুঁকতে থাকা, অন্ধকারাচ্ছন্ন একটা গোটা শহরকে এনে দিয়েছিল বাঁচার রসদ!
সন্ধিপূজা
নাপোলির তৎকালীন স্পোর্টিং ডিরেক্টর আন্টোনিও জ্যুলিয়ানো স্বয়ং বার্সার সাথে মারাদোনার ট্রান্সফার নিয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যে পৌঁছে গিয়েছিলেন স্পেনে। রেকর্ড ৬ মিলিয়ন পাউন্ডের ফি-এর বিনিময়ে নাপোলিতে সই করেন দিয়েগো। কথিত আছে, তাঁকে সই করানোর জন্য যে এক্সট্রা ফি দাবি করেছিল বার্সেলোনা, সেই ফি দেওয়া হয়েছিল নেপলস শহরের মানুষের তুলে দেওয়া সম্মিলিত চাঁদার মাধ্যমে। হয়তো তখন থেকেই মারাদোনাকে 'Saviour' ভেবে নিয়েছিল নেপলসের আপামর সাধারণ জনগণ।
তৎকালীন ইতালির অন্যান্য অংশের থেকে নেপলসের পারিপার্শ্বিক অবস্থা ছিল ভয়ানক। ইতালিয়ান মাফিয়া গোষ্ঠীদের পরোক্ষ শাসনের প্রভাবে এবং জনদারিদ্র্য, বেকারত্ব, সংগঠিত অপরাধের আঁতুড়ঘর হয়ে উঠেছিল নেপলস শহর। আর্জেন্টিনার বুয়েনস আয়রেসের দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা মারাদোনা এই শহরে যেন খুঁজে পেলেন নিজের ঘরের অনুভূতি। সই-পরবর্তী ইন্টারভিউতে মারাদোনা বললেন– "I want to become the idol of the poor children of Naples because they are like I was when I lived in Buenos Aires."
শহরের পারিপার্শ্বিক অবস্থার মতো, নেপলস শহরের প্রাণের ক্লাব নাপোলির অবস্থাও ছিল তথৈবচ। ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত নাপোলির 'স্কুদেত্তো' (ইতালিয়ান লিগ খেতাব) এর সংখ্যা ছিল শূন্য, পরপর দু'টি সিজন রেলিগেশন থেকে কোনওমতে বেঁচে সেরি আ-তে টিকে ছিল তারা। ঠিক যে কারণে ভেরোনা শহরের মাঠে হালাস ভেরোনার বিপক্ষে খেলতে নেমে মারাদোনা-সহ নাপোলি দলকে শুনতে হয়েছিল ব্যঙ্গাত্মক স্লোগান ‘লাভাতেভি, লাভাতেভি’– যার অর্থ হল ‘পরিষ্কার হয়ে এসো'। চিৎকার করতে থাকা বিত্তবান শহরের ভেরোনা সমর্থকরা বুঝিয়ে দিলেন নেপলস দীনহীনের শহর, নাপোলি গরিবদের ক্লাব। তাই পরিষ্কার হয়ে এসো। যদিও সেই উদ্ধত সমর্থকরা সেদিন বোঝেননি, তাঁদের ঔদ্ধত্যের মুখে কী সজোরে আঘাত করতে চলেছেন মারাদোনা!
১৯৮৪-৮৫ সিজনে অষ্টম স্থানে শেষ করে নাপোলি। তাদের শেষ কয়েক বছরের তুলনায় যা অনেক ভালো রেজাল্ট ছিল। ওটাভিও বিয়াঙ্কি ম্যানেজার হয়ে আসেন। পরবর্তী সিজনে অর্থাৎ ১৯৮৫-৮৬ সিজনে নাপোলি শেষ করে তৃতীয় স্থানে। এবং ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিতিয়ে আসা মারাদোনা ১৯৮৬-৮৭ সিজনে নাপোলিকে নিয়ে চললেন কাঙ্খিত সাফল্যের উদ্দেশ্যে! শহরের প্রথম স্কুদেত্তো! ফিওরেন্তিনার সাথে ১-১ ড্র করে শিরোপা নিশ্চিত করে ফেলার পরেই উৎসবের আলোয় ভেসে গিয়েছিল নেপলস শহর। সপ্তাহব্যাপী উৎসব চলেছিল সেবার, অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনে দেবদূত হয়ে দেখা দিয়েছিলেন মারাদোনা। একই সিজনে, ফাইনালে এগ্রিগেটে ৪-০ গোলে আটালান্টাকে হারিয়ে কোপা ইতালিয়া জেতে নাপোলি। ১৯৮৯ সালে নাপোলি ইউয়েফা কাপ জেতে ভিএফবি স্টুটগার্টকে ২-১ ও ৩-৩ গোলে হারিয়ে, যা নাপোলির ইতিহাসে প্রথম ইউরোপিয়ান ট্রফি জয়। ১৯৯০ সালে দ্বিতীয়বার স্কুদেত্তো জেতে নাপোলি। এবং এই সবকিছুর নেপথ্য নায়ক ছিলেন নেপলসের প্রেমিক, দিয়েগো মারাদোনা!
কিন্তু সমস্ত উত্থানের গল্পে কোথাও না কোথাও জুড়ে থাকে পতনের গল্প। প্রদীপের উজ্জ্বল আলোর নীচেই যে থাকে অন্ধকার– সেই অমোঘ সত্যিকে প্রমাণ করেছিল নেপলসের কাছে ভগবান হয়ে ওঠা মারাদোনার ইতালিতে খেলার শেষ কয়েকটা বছর।
বিসর্জন
দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা মারাদোনা যখন নেপলসে আসেন, প্রচুর অর্থের প্রাচুর্য্য তাঁকে ভালোই লুব্ধ করেছিল। শোনা যায়, নেপলসের তৎকালীন সবথেকে বড় মাফিয়া ক্ল্যান জ্যুলিয়ানো পরিবারের মাফিয়া কার্মাইন জ্যুলিয়ানোর বিশেষ স্নেহধন্য ছিলেন মারাদোনা। দামি গাড়ি, উপহার, একাধিক শয্যাসঙ্গিনী এবং কোকেনের নেশায় মারাদোনাকে আসক্ত করে ফেলেছিলেন কার্মাইন। ১৯৮৮ সালে ফুটবলকেন্দ্রিক জুয়াচক্রের অধিকর্তা কামোরা ফ্যামিলিকে দেউলিয়া করে দেওয়ার ক্ষমতা ছিল নাপোলির, কারণ লিগ জেতার দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল তারা। অদ্ভুতভাবে নাপোলি শেষ পাঁচ ম্যাচে পয়েন্ট নষ্ট করে এবং এসি মিলান চ্যাম্পিয়ন হয়। শোনা যায়, প্লেয়ারদের কাছে বার্তা এসেছিল সরাসরি। মারাদোনার গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। সতীর্থ সালভাতোরে বানির বাড়িতে দু'বার ডাকাতি হয়। এসবই স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল মাফিয়াদের আক্রমণের।
কিন্তু এখানেও আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়েছিল একটি ফুটবল ম্যাচ। ১৯৯০ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয়েছিল ইতালির। যে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল নাপোলির ঘরের মাঠ, সান পাওলোতে! উক্ত ম্যাচে মারাদোনা উইনিং পেনাল্টি মেরে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে নিয়ে যান। আর সেদিন থেকে নেপলসের একাংশের কাছেও মারাদোনা হয়ে যান ভিলেন। স্বপ্নের নায়ককে ঘিরে জমে ওঠে রাগ, অভিমানের মেঘ। এমনকী, প্রায় দাঙ্গা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল গোটা নেপলস শহরে।
১৯৯১ সালের মার্চে ড্রাগ টেস্টে অনুত্তীর্ণ হয়ে ১৫ মাসের ব্যানের মুখে পড়লেন মারাদোনা। দীর্ঘদিনের প্রেমিকা শেষদিনে যেভাবে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সেভাবেই 'দিওস' এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল সিংহভাগ নেপলস জনতা। তাই, ১৯৯২ সালে প্রায় নিঃশব্দেই শহর ছেড়ে চলে গেলেন দিয়েগো মারাদোনা। পিছনে রেখে গেলেন এক অনন্য প্রেমকাহিনী, ফুটবলের সাথে অতিসাধারণ মানবিক আবেগ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যাওয়ার তীব্র রোম্যান্টিকতা।
১৯৯২ সালে সেভিয়াতে গেলেও নিজের শ্রেষ্ঠ সময় হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। ১৯৯৭ সালে অবশেষে বুটজোড়া তুলে রাখেন ফুটবলের ঈশ্বর। যদিও ততদিনে সব অভিমান ভেঙে দিয়েগোকে আবার আপন করে নিয়েছিল নেপলসের জনতা। সম্প্রতি নাপোলি তাঁদের স্টেডিয়ামের নামকরণ করে 'Diego Armando Maradona' স্টেডিয়াম। আজও শহরের কোণায় কোণায় মিশে আছে তাঁকে নিয়ে আঁকা ম্যুরাল, দীর্ঘ সময় পর নাপোলির লিগ জয়ের সেলিব্রেশনে ঘুরে বেড়ায় 'মারাদোনা ১০' লেখা জার্সি।
যাঁর নামে শহরের গির্জা তৈরি হয়, যাঁর ছবি স্থান পায় শহরের প্রতিটি দোকানে মেরি ও যীশুর ছবির মাঝে, যাঁর গ্রাফিতি, ম্যুরাল ছড়িয়ে থাকে দেওয়াল থেকে দেওয়ালে, তাঁকে কি আর ভুলে যাওয়া যায়? ২০২০ সালে মারাদোনা চলে গেলেও অক্ষয় হলেন মানুষের মনে, নেপলসের হৃদয়ে। ভালোবাসায় তাঁকে আজও ভরিয়ে রেখেছে তাঁর প্রিয় শহর।
ফুটবল আর ভালোবাসা তো সত্যিই সমার্থক!
❤
ReplyDeleteThanks ♥️
DeleteWonderful ♥️
ReplyDeleteThanks ♥️
DeleteFabulous
ReplyDeleteThanks ♥️
DeleteSera likhechis ❤️
ReplyDeleteThanks ♥️
DeleteNice bhai..
ReplyDeleteThanks ♥️
DeleteAh this♥️
ReplyDeleteThanks ♥️
DeleteNice ❤️
ReplyDeleteThanks ♥️
Delete